Yamaha R15 V3 এর ৫০০ কিঃমিঃ টেস্ট রিভিউ লিখেছেন দেওয়ান সোহান

বাইকিং কমিউনিটিতে এই সময়ের হট ট্রেন্ড বাইক হচ্ছে Yamaha YZF R15 Version 3.0। মূলত এখন পর্যন্ত ২টি কোম্পানি বাংলাদেশে এই স্পোর্টস বাইকটি ইম্পোর্ট করেছে যার মধ্যে একটি হচ্ছে ইআরএস গ্লোবাল লিমিটেড/এমস্ল্যাজ বাংলাদেশ। যারা অগ্রিম বুকিং মানি দিয়েছিল তারা বেশ খানিকটা অপেক্ষার পর এটিকে হাতে পেতে শুরু করেছে চলতি আগষ্ট মাসের ১১ তারিখ থেকে (২০১৭)। রেসিং ব্লু, ম্যাট রেড এবং ম্যাট ব্ল্যাক কালারটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এসেছে। মোভিস্টার ইডিশনটি বাংলাদেশে আসতে আরো কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।

মূলত Yamaha R15 Version 3.0 হচ্ছে ইয়ামাহা R15 সিরিজের ৩য় ইডিশন। যদিও বাংলাদেশে ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের ইম্পোর্টার ACI Motors Ltd. কিন্তু তারা মূলত বাইকগুলো ইম্পোর্ট করে ইন্ডিয়া থেকে। যেহেতু ইন্ডিয়াতে এখনো R15 V3 রিলিজ হয়নি তাই ACI Motors Ltd. বাংলাদেশে বাইকটি নিয়ে আসতে পারছে না। বাংলাদেশে যে বাইকগুলো আসছে সেগুলো ইম্পোর্ট করা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া থেকে। আর ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের স্পোর্টস বাইকগুলোর পারফর্মেন্স যে পরীক্ষিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও প্রতিটি বাইকের কিছু ভাল এবং খারাপ দিক থাকে।

ERS Global আমাকে তাদের ফ্যাক্টরী (নারায়ণগঞ্জ) থেকে বাইকটি হ্যান্ডওভার করেছে ১৪ই আগষ্ট আর গত ৬ দিনে আমি বাইকটি চালিয়েছি ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি। সব মিলিয়ে বাইকটি আসলে কেমন লাগলো এবং কি কি ভালো মন্দ দিক চোখে পড়ল তা নিয়ে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব।

বাইকটি হাতে পাওয়ার প্রথম দিনই আমি প্রায় ৩৭৫ কিঃমিঃ চালিয়ে ফেলেছি। ঢাকা থেকে রংপুর এসেছি ৩টি ব্রেক দিয়ে। ইচ্ছে ছিল ব্রেকিং পিরিয়ড মেনে বাইকটি চালানোর কিন্তু ঢাকা থেকে রওনা করতে খানিকটা দেড়ি হয়ে গিয়েছিল। রাস্তার শোচনীয় অবস্থা, জ্যাম আর খুব যাতে রাত না হয়ে যায় তাই সু্যোগ পেলে মাঝে মাঝে ৮০-৯০ কিঃমিঃ গতিতে রাইড করছি। নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা করেছিলাম আনুমানিক সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে আর রংপুরে এসে পৌছেছি রাত ৯টায়। দিন, রাত, অন-রোড, অফ-রোড ইত্যাদি সব অবস্থায় বাইকটি চালিয়ে আরও খুটিনাটি বিষয়গুলো বুঝতে সুবিধা হয়েছে।

R15 Test Review

Yamaha R15 V3 এর Front End আমার কাছে অসাধারন লেগেছে। এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে শুধুমাত্র Honda CBR 150 Indonesia-এর সামনের সৌন্দর্যকে। Version 3.0-এর এরোডাইনামিক শেপটি একটি অতুলনীয় ডিজাইন যা এটিকে অধিক আকর্ষনীয়, কার্যকরি এবং রেসিং লুকস প্রদান করেছে। শুধু তাই নয় V3-এর এই অসাধারন ডিজাইন কন্সেপ্টটি এর মাইলেজ এবং টপস্পীড বেশি পেতে সাহায্য করবে।

R15 V3 Front end

এটিতে অটো হেডলাইট অন (AHO) সিস্টেমটি রয়েছে তাই বাইকের সুইচ স্টার্ট করলেই হেডলাইটি জ্বলে ওঠে। V3-এর হেড এবং টেইল দুটি লাইটই LED যা এই সিরিজে নতুন এডিশন। আমি বাইকটি রাতে প্রায় ১২০ কিঃমিঃ চালিয়েছি এবং এর ফ্রন্ট হেডলাইট আমাকে মুগ্ধ করেছে। ছোট আকারের হলেও বাইকটির হেডলাইট যথেষ্ট আলো প্রদান করে। আর তাই অতিরিক্ত কোন ফগ লাইট লাগানোর প্রয়োজন হবে না বলে মনে করি। R15 V1 এবং V2 এর মত V3 এর সামনের ইন্ডিকেটর লাইটগুলো হেডলাইট থেকে তুলনামূলক বেশ খানিকটা নিচে আর যখন এই লাইটগুলো জ্বলতে থাকে তখন তা দেখতে বেশ এগ্রিসিভ লাগে। এর ইন্ডিকেটর লাইটগুলো একটি রাবারের ফ্রেমের মধ্যে আটকানো তাই কোথাও লাগলেও ভেঙ্গে যাওয়ার সুযোগ খুব কম।

বাইকটির ড্যাশবোর্ড সম্পূর্ন ডিজিটাল যেটিতে প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় ফিচার রয়েছে যেমনঃ গিয়ার ইন্ডিকেটর, ডিজিটাল আরপিএম মিটার/টেকোমিটার, ফুয়েল গেজ, মাইলেজ রিডার, ট্রিপ মিটার, ক্লক, ওডোমিটার, স্পীডোমিটার ইত্যাদি। তবে টপস্পিড রেকর্ডার অপশন নেই। এর ফুয়েল গেজটি খুব এক্স্যাক্ট ডাটা দিতে পারে বলে মনে হয়েছে।

R15 V3 Mileage

R15 V3-এর হ্যান্ডেলবারে অতিরিক্ত যে ফিচারটি যুক্ত করা হয়েছে তা হচ্ছে ডাবল ইন্ডিকেটর লাইট ON সুইচ। এটি বাইকের জন্য বেশ দরকারি একটি ফিচার। কোন চৌরাস্তার মোড়ে যদি একজন বাইকার সরাসরি সামনের দিকে যেতে চায়, বিপদজনক কোন মূহুর্তে যেমন বৈড়ি আবহাওয়া কিংবা বাইকে কোন ত্রুটি থাকা সর্তেও আপনাকে খানিকটা রাইড করতে হচ্ছে ইত্যাদি নানান রকম প্রয়োগ রয়েছে এই ফিচারটির।

আর একটি পজিটিভ দিক হচ্ছে এর হ্যান্ডেলবারটি অনেক দূর পর্যন্ত মুভ করা যায়। যেটি আপনাকে অল্প জায়গার মধ্যে মোটরসাইকেলটি ঘুরিয়ে নিতে সহায়তা করবে। সাধারনত এই ধরনের স্পোর্টস বাইকগুলোর হ্যান্ডেলবার খুব একটা বেশি দূর পর্যন্ত ঘুরানো করা যায় না।

এর ফুয়েল ট্যাঙ্কটি দেখতে বেশ আকর্ষনীয়। তবে আকারে বড় মনে হলেও এটি ১১ লিটার পর্যন্ত ফুয়েল ধারন করতে পারে। মূলত ফুয়েল ট্যাঙ্কটির বাহিরের আবরণটি প্লাস্টিকের এবং ভিতরে স্টিল ট্যাঙ্ক রয়েছে। ইয়ামাহার বেশ কিছু নামকরা স্পোর্টস বাইকে প্লাস্টিক ফুয়েল ট্যাঙ্ক ব্যবহার করা হয়। প্লাস্টিক ফুয়েল ট্যাংকের কিছু পজিটিভ এবং নেগেটিভ সাইড রয়েছে। সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর ফুয়েল ট্যাঙ্ক আমার ভালো লেগেছে।

R15 V3 Fuek Tank

এর ফেয়ারিং কিংবা বডি কীটগুলো দেখতে বেশ কিন্তু আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল। আমি সব থেকে হতাশ এর চেইন কাভার, সিট এবং প্লাস্টিক জাতীয় টুকিটাকি কিছু জিনিস নিয়ে। নিম্নমানের করেছে এই জিনিসগুলি যা এমন বেশি বাজেটের বাইকে প্রত্যাশিত নয়।

R15 Version 3.0-এর সিটিং পজিশনটি একেবারে ট্রেডিশনাল স্পোর্টস বাইকের ন্যায় এবং আমার কাছে বেশ চমৎকার লেগেছে। সারাদিন রাইড করার পরও কোমরে কোন ব্যাথা অনুভব করিনি।এর প্রতিদ্বন্দ্বী স্পোর্টস বাইকগুলোর তুলনায় এর সিটের উচ্চতা, বাইকটির দৈর্ঘ্য এবং প্রস্ত সব দিক থেকে বড়। যাদের উচ্চতা ৫ ফিট ৮ ইঞ্চিয়ের বেশি তাদের জন্য বাইকটি পারফেক্ট এবং ৫ ফিট ৬ ইঞ্জি উচ্চতার নিচে রাইডারদের জন্য বাইকটি অনুপযোগি বলে আমার মনে হয়েছে।

যত দিন যাচ্ছে স্পোর্টস বাইকের পিলিওন সিট তত বসার অনুপযোগি হচ্ছে। সেক্ষেত্রে CBR Indo, R15 V2, Yamaha M Slaz এর থেকে V3-এর ব্যাক সীট অনেক কমফোর্ট বলতেই হবে। যদিও সিটটি কিছুটা উচু কিন্তু সামনের দিকে খুব একটা ঢালু নয়। তাই মহিলা পিলিয়ন নিয়েও সুন্দর রাইড করতে পারবেন বলে আশা করি। তবে সিটটি কিছুটা শক্ত তাই দীর্ঘক্ষণ বসে থাকাটা কষ্টসাধ্য।

R15 V3 Pillion Seat

কম এবং বেশী RPM অনুযায়ী বাইকটির সাউন্ড কিছুটা পরিবর্তিত হয়। উভয় অবস্থায় এটির সাউন্ড খুবই অসাধারন। তবে এর Exhaust-টি আর সুন্দর হতে পারত। সাধারণত রেসিং বাইকগুলোর Exhaust-এর ডিজাইন বেশ এগ্রিসিভ হয়।

R15 V3 Exaust

R15 V3-এর সাসপেনশনকে আমি দশে নয় দিব। এক কথায় ইয়ামাহা এতে চমৎকার প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। ঢাকা-রংপুর হাইওয়ের অবস্থা এখন খুবই নাজুক। ঢাকা থেকে ফেরার পথে উঁচু-নিচু, ছোট-বড় অনেক গর্তে পড়তে হয়েছে। এমনকি একবার তো স্পীড ব্রেকার চোখেই পড়েনি। খুব একটা ঝাকি অনুভব করিনি এমন অবস্থায়ও। আমার বাইকের একজন পিলিওন বলেছে বাইকটিতে ভলভো বাসের মত এক ধরনের ফিলিং রয়েছে।

বাইকটিতে ডাবল ডিস্ক ব্রেক রয়েছে এবং এর ব্রেকিংয়ের মানও যথেষ্ট ভালো। বিশেষ করে এর পিছনের ডিস্ক ব্রেকের কার্যকারিতা আমাকে সন্তুষ্ট করেছে। যদিও এটিতে এন্টি-লক ব্রেকিং (ABS) সিস্টেমের অভাব অনুভব করেছি। শোনা যাচ্ছে আগামী বছর থেকে V3-তে ABS সিস্টেম পাওয়া যাবে।

R15 V3 Brake and Suspension

এর পিছনের চাকা ১৪০/৭০ মিঃমিঃ। আর বেশির ভাগ বাইকারই চায় যে তার মোটরসাইকেলের ট্যায়ার মোটা হোক। এটি দেখতে যেমন আকর্ষনীয় তেমনি উপকারি। সাধারনত বাংলাদেশে এর প্রতিদ্বন্দ্বী বাইকগুলোর কোনটিরই রেয়ার ট্যায়ার এত মোটা নয়।

R15 V3 Rear Tyre

সাধারনত একেবারে নতুন অবস্থায় মাইলেজ কিছুটা কম পাওয়া যায়। কিন্তু নতুন অবস্থায় বাইকটির মাইলেজ পাচ্ছি অন্ততঃ ৪৫ কিঃমিঃ/লিটার। এর ড্যাশবোর্ডে এমন মাইলেজ রিডিং দেখে সত্যি আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। ২ দিন পর ম্যানুয়ালি হিসেব করে দেখি আসলেই তাই। বুঝতে পারলাম ইয়ামাহার ব্লু কোর এবং ভিভিএ টেকনোলজি আসলেই বেশ কার্যকারি।ব্লু কোর এবং ভিভিএ-এর উপকারি দিকগুলো হল এটির ইঞ্জিনে যে পরিমান শক্তি  উৎপন্ন হয় তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, ইঞ্জিকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করা, অধিক মাইলেজ এবং গতি উৎপন্ন করতে সহায়তা করা।  বাইকটির এয়ার ক্লিনার আকারে বেশ বড় যা বাইকটির ভালো পারফর্মেন্স সহায়ক।

বাইকটির ব্রেকিং পিরিয়ড চলছে তাই এখনো টপস্পীড উঠাতে চেষ্টা করিনি। ২০০০ কিলোমিটারের পর আর একটি টেস্ট রিভিউ লিখতে চেষ্টা করব। আশা করি তখন বলতে পারব বাইকটির টপস্পীড কত পর্যন্ত উঠানো যায়। অনলাইন মারফত জানতে পেরেছি এর টপস্পীড ১৫০ কিঃমিঃ/ঘন্টা এর মত। তবে ৮০-৯০ কিঃমিঃ/ঘন্টা গতিতে বাইকটির সাউন্ড এবং স্মুথনেস বলে দেয় এটাতে খুব কম সময়ে স্পীড ১৩০ কিঃমিঃ/ঘন্টা পর্যন্ত উঠে যাবে। এর এক্সিলারেশন ক্যাপাসিটি দেখে মনে হয়েছে শর্ট ডিসটেন্স রেসে এটি বাংলাদেশের যে কোন বাইককে হার মানাতে পারবে।

এটিতে সিক্স স্পীড গিয়ার বক্স রয়েছে। বাইকটিতে ব্যবহার করা হয়েছে স্লিপার ক্লাচ যা সাধারণত অধিক সিসি’র মোটরসাইকেলগুলোতে ব্যবহার করা হয়। স্লিপার ক্লাস বর্তমানে ট্র্যাক রেসিং এ অনেক জনপ্রিয়। রেসিং বাইক রাইডাররা যখন রেসিং এর সময় কর্নারিং করেন তখন ইঞ্জিনের শক্তি কমাতে হয়, ফলে তাদের স্পিড কমে যায় এবং স্লিপার ক্লাচ ব্যবহার করা হয় সেটার প্রভাব প্রশমিত করতে। স্লিপার ক্লাচ রেসারদেরকে খুব দ্রুত ল্যাপ শেষ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি বাইকারদের ফাস্টার কর্নারিং এর ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কারণ স্লিপার ক্লাচ থাকলে একদম শেষ মুহূর্তে ব্রেক করলেও কোন সমস্যা হয় না। স্লিপার ক্লাচ ব্যবহারের কারণে R15 V3-এর গিয়ার খুব স্মুথলি কাজ করে।

অধিক বাজেটের বাইক হওয়া সর্তেও এটির কোন ইঞ্জিন এবং সার্ভিস ওয়ারেন্টি নেই যা সত্যিই হতাশজনক। আপাততঃ V3-এর যে কোন পার্টস পাওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হবে। তবে R15 V3 বাইকের সংখ্যা খুব দ্রুত হয়তো বাংলাদেশে বেড়ে যাবে এবং মোটামুটি সব ধরনের পার্টস পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

আমি আমার অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি কোন ভূল ত্রুটি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

 

লিখেছেনঃ দেওয়ান সোহান

About The Author

Related Posts

error: Content is protected !!