Lifan KPR 150 এর ব্যবহারকারী দেওয়ান সোহান লিখেছেন বাইকটির রিভিউ

রাসেল ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের হাত ধরে Lifan KPR 150 বাংলাদেশে আসে ২০১৫ সালের মার্চের দিকে। এর অসাধারন লুকস এবং সুলভ মূল্য অনেক বাইকারদের আগ্রহী করে তোলে। কিন্তু এর উৎপাদনকারী দেশ চীন হওয়ায়, এর স্থায়িত্ব এবং পারফরমেন্স নিয়ে প্রশ্নের যেন শেষ নেই। সব মিলিয়ে শুরু হয় সমালোচনা এবং আলোচনার ঝড়।

২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাহির মটরস থেকে আমি KPR 150 বাইকটি (পার্পেল কালার) নেই। বাইকটি কিনবো কি কিনবো না, এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ আমারও ছিল। বুঝে কিংবা না বুঝে এর পক্ষে এবং বিপক্ষে অনেকেই অনেক পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু তথ্যের ভান্ডার গুগল আর ইন্টারনেটই ছিল আমার ভরসা।

চাইনিজ মোটরসাইকেল বলে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখার প্রশ্ন আসে না। কারন প্রযুক্তির দিক থেকে চীন সারা বিশ্বে স্বনামধন্য। বিশ্বের নামিদামি যত মোটরসাইকেল উৎপাদকারি কোম্পানি রয়েছে, বেশিরভাগই তাদের বানানো মোটরসাইকেল এর কমপক্ষে একটি পার্টস চীন থেকে বানিয়ে নেয়। তবে চীনে প্রযুক্তিগত পন্য খুব সহজলভ্য মূল্যেও পাওয়া যায়। আর তাই বিশ্বের নানান দেশ চীন থেকে নানান ধরনের পন্য আমদানি করে। বাজেট যেমন হবে পন্যের মানও তেমন হবে এটাই স্বাভাবিক। ক্রেতাদের ভয়টা মূলত এখানেই।

তবে লিফানের ক্ষেত্রে এটি নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই বললেই চলে। কারন এটি চীনের অন্যতম সেরা একটি মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। আর তাই মান নিয়ন্ত্রনের ভাবনাও তাদের। যে কেউ চাইলে লিফানের পন্য সস্তায় আমদানি করতে পারে না। ১৯৯২ সালে এই কোম্পানীটি যাত্রা শুরু করে এবং বর্তমানে এটি কার, কমার্সিয়াল ট্রাক, মাইক্রোওভেন এবং মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে। লিফান যে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান সেটি গুগল করলে সহজেই বোঝা যায়।

Lifan Headquarter

লিফান গ্রুপ হেড-কোয়ার্টার

ইন্টারনেট মারফত জানতে পারি, চীনে ১৫০ সিসি বাইকের রেসে লিফান কেপিআর ১৫০-এর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খবর। ২ – ১ জন যারা এই বাইকটি ইতোঃমধ্যে কিনেছে তাদের সাথে যোগাযোগ করি এবং মোটামুটি ভাল ফিডব্যাক পাই। সাথে নিজের ভাল লাগাকে মূল্যায়ন দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাইকটি নিব বলে এভাবেই সিদ্ধান্তে উপোনীত হই।

২ বছরে বাইকটি প্রায় ১৬,০০০ কিঃমিঃ চালিয়েছি। কেপিআর-এ চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি বাংলাদেশের ২০টিরও বেশি জেলা। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করে আসলে বাইকটি কেমন ? মাইলেজ কত ? দীর্ঘস্থায়ি হবে কি ? ইত্যাদি। আজ চেষ্টা করব নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে Lifan KPR 150 এর ভাল-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরার।

বিছানাকান্দি, সিলেট

কথায় বলে, আগে দর্শনধারী এরপর গুনবিচারী। KPR এর সবচেয়ে পজ়েটিভ দিক হচ্ছে এর অসাধারন লুকস। ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বাজেটের মধ্যে বাংলাদেশে এমন ফুল ফেয়ারড স্পোর্টস লুকিং বাইক নেই বললেই চলে। কালার, স্টিকার এবং ডিজাইন কম্বিনেশনও চমৎকার।

বাইকটির আর একটি প্রশংসনীয় অংশ হচ্ছে এর LED Headlight. রাসেল ইন্ডাস্ট্রি মোটামুটি চ্যালেঞ্জ করেছে যে, এর থেকে বেশি আলো দিতে পারে এমন কোন মোটরসাইকেল বাংলাদেশে নেই। আসলেই এর আলো যথেষ্ট পরিমান। আর তাই হাইওয়ে রাইডিং কিংবা শীতকালেও কখনো অতিরিক্ত ফগ লাইট লাগানোর প্রয়োজন হয়নি। এর পার্কিং লাইটের ডিজাইনটি বেশ চমৎকার এবং অতুলনীয়। খুব সহজে অনেক দূর থেকে KPR-কে চিহ্নিত করা যায় শুধু মাত্র এর লাইট দেখে। KPR এর ইন্ডিকেটর এবং টেইল লাইটটিও প্রশংসার দাবি রাখে। ইন্ডিকেটর লাইটগুলোতে রাবারের স্যান্ড যুক্ত থাকায় ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবণতা খুবই কম।

এর ড্যাসবোর্ডটিতে প্রয়োজনীয় প্রায় সব অপশন রয়েছে। তবে ঘড়িটি মাসে ১০ মিনিটের মত স্লো হয়ে যায় এবং ফুয়েল ইনডিকেটরটি খুব এক্স্যাক্ট ডাটা দিতে পারে না।

ফেয়ারিং কিংবা বডি কীটগুলো বেশ শক্তিশালি। ২ – ১ বার বাইকটি পড়ে গিয়েছিল। দাগ পড়েছে কিন্তু ফেটে যায়নি। এমন আরো অনেক বাইকারের কাছে কেপিআর-এর কীটের গুণগান শুনেছি। এর পিলিওন সিটটি কিছুটা শক্ত, যেটি আরামদায়ক হলে ভালো হত।

এর লুকিং গ্লাসগুলো বাইকটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে ঠিকই, তবে এটির স্থান নির্বাচন কিংবা কার্যকর প্রয়োগ ঠিকঠাক হয়নি বলে আমার মনে হয়েছে। এখন পর্যন্ত কারো কাছে এই বিষয়ে অবজেকশন শুনিনি ঠিকই কিন্তু একবার লুকিং গ্লাসটি হাতে এসে লেগে হাত কেটে গিয়েছিল। বাইকের ঠিক সামনে একজন পথচারি তার হাত ঘুরিয়ে নিতে লুকিং গ্লাসটি রাইডারের (আমার) হাতে এসে চাপ পড়ে ভেঙ্গে গিয়ে এমনটি ঘটেছিল। আশা করি রাসেল ইন্ডাস্ট্রি লিফান মোটরসকে বিষয়টি জানাবে।

ডিস্ক ব্রেকের মান যথেষ্ট ভালো। গতি যতই হোক না কেন খুব দ্রুত স্পীড কমিয়ে বাইক নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। ব্রেক চাপতে কম বেশি করলে চাকা মাঝে মাঝে একটু স্কীড করেছে তবে মোটেই নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। সব মিলিয়ে বাইকটির কন্ট্রোল এবং ব্রেকিং সিস্টেমকে আমি দশে আট দিব।

স্পীড ব্রেকারের উচ্চতা একটু বেশি হলেই সাইল্যান্সার পাইপে লেগে যায়। বাংলাদেশের রাস্তা ঘাটের অবস্থার কথা চিন্তা করে স্যাইল্যান্সার পাইপটি আরও উঁচুতে সেট-আপ করা উচিত ছিল। কেপিআর-এর আর একটি নেগেটিভ দিক হচ্ছে গিয়ার, যেটি কিনা কিছুটা শক্ত।

Lifan KPR 150-এর টপস্পীড আমার বাইকে পেয়েছি ১২৬ কিঃমিঃ/ঘন্টা, তবে এটি আরও বেশি উঠানো সম্ভব বোঝা যায়। পরিচিত অনেকেই এর টপস্পীড ১৩৫ কিঃমিঃ/ঘন্টা-এর মত পেয়েছে। ১১০ – ১১৫ কিঃমিঃ/ঘন্টা পর্যন্ত স্পীড খুব অল্প সময়ে ওঠে কিন্তু এরপর স্পীড বাড়তে কিছুটা বেশি সময় নেয়। আর এখানেই স্পীডের পার্থক্য তৈরি হয়ে যায় সিবিআর কিংবা আর১৫ এর মত বাইকগুলোর সাথে। তবে সর্বোচ্চ গতিতেও এতে খুব হালকা ভাইব্রেশন অনুভূত হয়। ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজেটের মধ্যে অন্যান্য ১৫০ সিসি’র বাইকগুলোর সাথে তুলনা করলে কেপিআর-এর এক্সিলারেশন এবং টপস্পীড দু’টোকেই সামনের সারিতে রাখতে হবে। এক কথায় স্পীডের দিক থেকে কেপিআর অসাধারন।

একটি স্পোর্টস বাইক হিসেবে KPR-এর সাউন্ড নিয়ে আমি আনন্দিত হতে পারিনি। এর থেকে ইন্ডিয়ান বাইকগুলোর সাউন্ড ভাল বলতে হবে। সিটিতে এর মাইলেজ পেয়েছি ৩৪ কিঃমিঃ/লিটার এবং হাইওয়েতে ৩৮ কিঃমিঃ/লিটার। এটি হাইওয়েতে রাইড করাটা বেশ আনন্দদায়ক কিন্তু ওজন ১৫০ কেজি হওয়ায় সিটিতে জ্যামে মুভ করতে নতুন অবস্থায় একটু কষ্ট হতে পারে। লং ট্যুরের জন্য এই বাইকটি বেশ ভালো। ১৫০ – ২০০ কিঃমিঃ টানা চালানোর পর নিজের রেস্ট নিতে হয়েছে কিন্তু বাইককে কখনও রেস্ট দেয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। এর ওয়াটার কুলড সিস্টেমটি বেশ কার্যকরী যা ইঞ্জিনের তাপমাত্রাকে দ্রুত কমিয়ে আনতে সক্ষম।

এর সিটিং পজিশন ট্রেডিশনাল স্পোর্টস এবং কমিউটার বাইকের মাঝামাঝি বলা যেতে পারে। দিনে ২০০ – ৩০০ কিঃমি রাইড করলেও কোমরে কোন ব্যাথা অনুভব করিনি। তাই এর সিটিং পজিশন ভালই বলতে হবে। এর ফ্রন্ট এবং রেয়ার সাসপেনশন ইন্ডিয়ান বাইকগুলোর তুলনায় ভাল মানের বলা যায়।

suspension

KPR ক্রেতাদের সার্ভিসিংয়ের ব্যাপারে রাসেল ইন্ডাস্ট্রি বেশ আন্তরিক। তারা ইঞ্জিন ওয়ারেন্টি ২ বছর কিংবা ২০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত এবং ৫ বছর পর্যন্ত ফ্রী সার্ভিসিং দিয়ে থাকে। প্রতি ৩ – ৪ মাস পর পর একটি সার্ভিস টিম দেশের সকল ডিলার পয়েন্টে কাস্টমার সার্ভিস দিয়ে থাকে। তবে হটাৎ সার্ভিসিংয়ের দরকার পড়লে সেটা শুধু ঢাকাতেই পাওয়া যায়। হয়তো লিফান বাংলাদেশে আরো বিস্তার লাভ করলে এমন সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। ডিলার পয়েন্টগুলোতে অর্ডার করে কিংবা রাসেল ইন্ডাস্ট্রিয়ের অফিসে ফোন করে কুরিয়ারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পার্টস কিনতে পাওয়া যায়।

বিগত ২ বছরে বাংলাদেশে লিফানের অনেক সংখ্যক মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। তবে এখনও মোটরসাইকেল ব্রান্ড হিসেবে লিফান বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে আরও সময় লাগবে হয়তো। এর কিছুটা প্রভাব পড়ে কেপিআর বিক্রি করতে গেলে। যদিও দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে এবং অতি শিঘ্রই KPR ব্যবহৃত বাইক ইন্ডিয়ান বাইকগুলোর ন্যায় সমান দামে বিক্রি বলে নিশ্চিত ভাবে আশা করা যায়।

সুবিধা কিংবা সুবিধা যাই বলুন না কেন, Lifan KPR 150 বাইকটি চালানোর পর যদি নতুন কোন বাইক কিনতে চান তাহলে দেখবেন তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বাজেটের মধ্যে কোন বাইকই ঠিক যেন আপনার মনের মত হচ্ছে না।

আপনি যে বাইকই কিনুন না কেন সব কিছু মনের মত পাবেন না। ভাল মন্দ দিক বিবেচনা করে নিজের পছন্দকে সবার আগে মূল্যায়ন করাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি। ২ লক্ষ টাকা বাজেটের মধ্যে Lifan KPR 150 বেশ ভালো মানের মোটরসাইকেল তা বলতেই হবে।

About The Author

Related Posts

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: