একটি ১৮৫০+ কি:মি: বাইক ভ্রমণের গল্প [রংপুর-ঢাকা-সিলেট-রংপুর] – শেষ পর্ব

যে বাসায় বিগত ২ রাত থেকেছি তাদের কাছে বিদায় নেই। গুগল ম্যাপে খুঁজে নেই সব থেকে শর্ট-কার্ট রাস্তা, এবার একটু অন্য রকম বিপাকে। আমরা যেই পথ বেছে নিয়েছি আসার জন্য, সেটা একদম গ্রামদের ভিতর দিয়ে। আসলে বাইক ট্যুরে হাইওয়ে রাস্তা বেছে নেয়াই উত্তম, যদিও তাতে খানিকটা বেশি ঘুরতে হয়। এবার যেই ঝামেলায় পরে গেলাম তাতে একটু ঘাবড়িয়ে যাই। বাইকের চেইন লুজ হয়ে গিয়েছিলো, দেখলাম চেইনের একটা ইনার প্লেট ভেঙে গিয়ে হালকা আটকে আছে। চাকা ঘোরার সময় মাঝে মাঝে চেইন হুইলের দাঁতের সাথে লেগে খটখট শব্দ করছে। যে কোনো সময় চেইন ছিড়ে গেলেই বিপদ। রাস্তায় ২ – ১ জনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ৩ – ৪ কি:মি: দুরে মেকানিক্স পাওয়া যাবে। চেইনের উপর চাপ কমাতে ২-৩ গিয়ারের মধ্যেই, যতটা পারা যায় গিয়ার পরিবর্তন না করে বাইক চালালাম। ৩ – ৪ কি:মি দূর এসে একটা গ্যারেজ চোখে পড়লো। সেখানে চেইনের ইনার প্লেটটা পরিবর্তন করে, চেইনটাকে একটু টাইট কড়িয়ে নিলাম।

এতক্ষনে আমরা হাইওয়েতে চলে এসেছি। এখন মোটরসাইকেল একদম ওকে। ছুটতে থাকলাম আপন গতিতে। মাধবকুন্ড জলপ্রপাত যাওয়ার পথে বেশ কিছু নামকরা চা বাগান দেখতে পেলাম। এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু ছবি উঠলাম। এদিকের রাস্তাঘাট যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ ভালো, তবে রাস্তাগুলো খুব একটা প্রসারিত নয়। যখন আমরা স্পটের প্রায় ৮ – ১০ কি:মি: কাছাকাছি এসেছি তখন খুবই মনোমুগ্ধকর একটি চা বাগান দেখতে পাই। রাস্তা বেশ আঁকা-বাকা এবং মসৃণ। এই রাস্তায় বাইক চালিয়ে যেন MotoGP খেলার আনন্দ পেয়েছি। সত্যি অসাধারণ ছিমছাম একটি জায়গা। আমরা আশা করেছিলাম, মাধবকুন্ড জলপ্রপাতও অনেকটা বিছানাকান্দি কিংবা জাফলংয়ের মতই খোলামেলা হবে, কিন্তু এখানে এসে দেখি এটা শুধুই একটা পার্ক, যার ভিতরে টিকেট থেকে প্রবেশ করতে হয় এবং সিঁড়ি পথ ধরে ১০ – ১৫ মিনিট হাঁটলে একটি ছোটো খাটো ঝর্ণা পাওয়া যায়।

ছোট বেলা থেকে এই মাধবকুন্ড ঝর্ণার নাম শুনে এসেছি অনেকের কাছেই, বইয়েও পড়েছি কিন্তু এর বর্তমান অবস্থা সত্যি আমাকে নিরাশ করেছে। একটি প্রাকৃতিক জায়গায় যখন আর্টিফিসিয়াল কোনো কিছু দিয়ে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটার আসল রূপ নষ্ট হয়ে যায়। সব মিলিয়ে বিছানাকান্দি, জাফলং দেখে এসে মাধবকুন্ড আমাদের হতাশ করেছে। যদিও এটি একটি নামকরা পার্ক তবু এখানে মোটরসাইকেল কিংবা সাইকেল রাখার মত কোনো গ্যারেজ নেই। আমরা অবশ্য দারোয়ান মামাকে বলে, ৫০ টাকা চার্জ দিয়ে ২০ মিনিটের জন্য মোটরসাইকেলটি স্পটের গেটের ভিতরে রেখে গিয়েছিলাম। পার্কের বাইরে ২ – ৩ টি বড়োসড়ো হোটেল রয়েছে কিন্তু এখানেও খাবার মনের মত হলো না। ফেরার পথে একবার সার্জেট (পুলিশ) আটকালেও, কাগজ পত্র দেখে ছেড়ে দিলো। রাত ৮টার মধ্যে শ্রীমঙ্গল শহরে এসে পৌঁছি. শ্রীমঙ্গলের আশে পাশে চা বাগান ছাড়াও দেখার মতো বেশ কিছু জায়গা রয়েছে যেমন হামহাম জলপ্রপাত, লাওয়াছরা বন, মাধবপুর লেক ইত্যাদি। প্রথম দিকে আমাদের ইচ্ছে ছিলো সুনামগঞ্জের দিকেও যাওয়ার। যদিও আমরা সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখছি, মনের আনন্দে ঘুরছি-ফিরছি, তবুও যেন কিছু একটা টান অনুভব করছি, আর সেটা হচ্ছে ঘরে ফেরার টান। আমরা সিদ্ধান্ত নেই কাল ঢাকায় ফিরে যাবো। ঢাকায় রাতটা থেকে রংপুরে ব্যাক করবো। যা দেখেছি আলহামদুলিল্লাহ। বেঁচে থাকলে হয়তো আরো কোন একদিন আসা হবে।

আপুর বাচ্চা দুটো খুব সুন্দর আর মায়াবী, সামান্য ২ দিনে আমাদেরকে খুব আপন ভাবতে শুরু করেছিলো। কিন্তু বিদায় নেবার পালা এসে গেলো। সকালে আপুর বাসা থেকে বিদায় নেই।

শ্রীমঙ্গলে এসেছি কিন্তু চা না নিয়ে ফিরবো সেটা কেমন হয়। দুলাভাই আমাদের সাথে এসে, নামকরা একটি দোকান থেকে “গোল্ডেন টি” নামের ২য় অথবা ৩য় গ্রেডের চা-পাতা কিনে দেয়। এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো, আমরা সাধারণত প্যাকেটজাত যেই চা পাতাগুলো কিনি সেটা আসলে ৭ম কিংবা ৮ম গ্রেডের চা-পাতা। ভালো গ্রেডের চা-পাতা গুলো সাধারণত বিদেশে রপ্তানি হয়।

আজ কোনো তরিঘরি নেই, হাতে বেশ খানিকটা সময়. আসার পথে চা বাগানের যেখানে ভালো লেগেছে দাঁড়িয়েছি আর মনের সুখে ছবি তুলেছি। বিকেল ৩টার মধ্যেই আমরা ঢাকা পৌঁছে যাই। ঢাকায় একটা ছোট কাজ ছিলো তাই ২ রাত থেকে ৩য় দিন দুপুর ২টার দিকে ঢাকা থেকে রওনা দেই রংপুরের উদ্দেশ্যে। এলেঙ্গা, ফুড ভিলেজ এবং ২ – ৩ জায়গায় বিরতি দিয়ে রাত ৯টার দিকে আমরা এসেছে পৌঁছায় আপন শহর রংপুরে। রংপুরে লালবাগে একটি চায়ের দোকানে প্রতিদিন আমরা বন্ধুরা আড্ডা দেই। আর ওইদিন সেখানেই আমরা সরাসরি আসি। ২ – ১ জনকে পেলাম। ঘুরে যেমন আনন্দ পেয়েছি, পৌঁছেও যেন তার থেকে বেশি আনন্দ পাচ্ছি। আবার এই দিনটি ছিল আমার জন্য একটি বিশেষ দিন, সেটা হচ্ছে আমার জন্মদিন। বন্ধুরা আমাকে বেশ একটা চমকও দিল। সব মিলিয়ে ২ জন মিলে এই ট্যুর বেশ আনন্দদায়ক, অভিজ্ঞতাময় আর মনে রাখার মতো ছিলো।

 

==================================

একটি ১৮৫০+ কি:মি: বাইক ভ্রমণের গল্প [রংপুর-ঢাকা-সিলেট-রংপুর] – পার্ট ১

একটি ১৮৫০+ কি:মি: বাইক ভ্রমণের গল্প [রংপুর-ঢাকা-সিলেট-রংপুর] – পার্ট ২

About The Author

Related Posts

Add Comment

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: